Golperjogot

Golperjogot

প্রেম কাহিনী – স্কুল জীবনের প্রেমের গল্প পর্ব 19 | Golpo

ঝর্ণাা নিজেকে সামলে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করল ।
কি করবে বা কি বলবে ভেবে ঠিক করতে পারল না। তার শরীর কাপতে লাগল।

তাকে চুপ করে দাড়িয়ে থাকতে দেখে সাইফুল আবার বলল, পরিচয় করতে এসে। কথা বলবেন না তাে এসেছেন কেন? ঝর্ণা কোনাে রকমে ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে মুখের নেকাব সরিয়ে দিয়ে বলল, সাইফুল, তুমি কি আমাকে ক্ষমা করতে পার না? নাজনীনকে পড়াতে এসে তােমার পরিচয় জানার পর থেকে অনুশােচনার আগুনে পুড়ে পুড়ে অঙ্গার হয়ে যাচ্ছি।

আমি যে আর সহ্য করতে পারছি না। কথা শেষ করে সে তার পায়ে দু’হাত রেখে বলল, বল, আমাকে তুমি ক্ষমা করেছ? তারপর সে সামলাতে পারল না, ফুপিয়ে কেঁদে উঠল।
ঝর্ণা মুখের নেকাব সরাতে সাইফুল তাকে চিন্তে পেরে প্রথমে চমকে উঠেছিল। এখন তার কথা ও কার্যকলাপ দেখেশুনে খুব অবাক না হলেও আনন্দে তার মন ভরে উঠল। বিলেতে ঝর্ণার চিঠি পাওয়ার পর সে যেন নবজন্ম লাভ করে।ভেবেছে, সত্যি সাত্য ঝণা কি এই চিঠি দিয়েছে? এখন তার এহেন ব্যবহারে নিশ্চিত হয়ে হাত ধরে। তুলে ভিজে গলায় বলল, এতদিন পর আমার শেষ সময়ে তুমি কেন এলে ঝর্ণ? তােমাকে পাওয়ার রাস্তা বন্ধ হয়ে যেতে দেখে ভেবে ঠিক করলাম, তােমার স্মৃতি নিয়ে এই দুনিয়া থেকে বিদায় নেব। ভাগ্যের লিখন একেই বলে। তুমি ক্ষমা চাইছ কেন? আমার ঝর্ণার অন্যায় কখনাে চোখে পড়ে নি

আমি সর্বদা তার সুখ শান্তি কামনা করে। এসেছি। তাইতাে তার শত অন্যায় অপরের চোখে ধরা পড়লেও আমার চোখে পড়ে নি। আমার সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে যত আনন্দ পেয়েছ, আমিও তার থেকে কম পাই নি। তাইতাে তােমার অন্যায়গুলাে আমার কাছে অমৃতের মতাে মনে হয়েছে। তাকে কাদতে দেখে বলল, তুমি কেঁদ না। তােমার কান্না আমি সহ্য করতে পারছি না।

 

তােমার সুখ ও শান্তির জন্য আমি আমার সমস্ত কামনা-বাসনা ত্যাগ করে বিদেশ চলে গিয়েছিলাম। সেই একই কারণে তােমার চিঠি পেয়ে ফিরে এসেছি। প্লীজ ঝর্ণা দে না। হাত জোড় করে বলছি কেঁদ না। আমি তােমাকে স্কুল জীবন থেকে অনেক বিরক্ত করেছি সেজন্য ক্ষমা চাইছি। আবার বলছি, তুমি কেঁদ না। যদি কান্না থামাতে না পার, তা হলে চলে যাও। তারপর সে আর কথা বলতে পারল না, কান্নায় তার গলা বন্ধ হয়ে এল। ঝর্ণা কাঁদতে কাঁদতেই তার দুটো হাত ধরে বলল, তুমি অসুস্থ আর কথা বলল না। আমি চলে গেলে তুমি যদি শান্তি পাও, তবে নিশ্চয় চলে যাব। তবে তার আগে দু’একটা কথা বলতে চাই।। সাইফুল বলল, বল কি কথা বলবে। তুমি যে আমাকে চলে যেতে বলছ, আমি তাে যাওয়ার জন্য আসি নি। সাইফুল আশুভরা চোখে বলল, তা হলে কিসের জন্য এসেছ? তুমি আমার চিঠি পেয়ে ফিরে এসেছ তা আমি সিওর। তবু যখন চলে যেতে বলছ তখন যাব।

কিন্তু জেনে রাখ, আমার যাওয়ার মতাে কোনাে জায়গা নেই একমাত্র আত্মহত্যা ছাড়া। আমিনের কাছ থেকে চলে আসার পর অনেকবার সেই পথে যেতে চেয়েছি। কিন্তু আল্লাহর কঠিন হুঁশিয়ারীর কথা মনে করে সে পথে যেতে পারি নি। তােমার দুয়ার খােলা আছে জেনে এসেছি। তুমিও যদি সেই দুয়ার বন্ধ করে দাও, তা হলে আল্লাহর হুশিয়ারী আগ্রাহ্য করে সেই পথ বেছে নেব। তার আগে একটা অনুরােধ করব রাখবে? সাইফুলকে চুপ করে থাকতে দেখে আবার বলল, আমি না হয় তােমার

কাছে অপবিত্র হয়ে গেছি। কিন্তু যে ঝর্ণা তােমার হৃদয়ের রক্তের সঙ্গে অহরহ প্রবাহিত হচ্ছে, সেই ঝর্ণার মাত্র একটা অনুরােধ রাখবে না? সাইফুল আর সামলাতে পারল না। তাকে দু’হাতে জড়িয়ে ধরে বলল, তুমি যদি সত্যি আর ফিরে যাওয়ার জন্য এসে না থাক, তবে অনুরােধ করবে কেন? আদেশ করে। দেখ, আমি তােমার আদেশ মানি কি না?

ঝর্ণা নিজেকে মুক্ত করে নিয়ে বলল, এবার তুমি মদ ছেড়ে দিয়ে একটা ভালাে মেয়ে দেখে বিয়ে কর। তা হলে তুমি তােমার সেই ঝর্ণাকে ভুলে যেতে পারবে। আর। আমি দূর থেকে তােমাদেরকে দেখে শান্তিতে মরতে পারব।

সাইফুল আবার তাকে জড়িয়ে ধরে বলল, ঝর্ণা আমার এই অবস্থায় তুমি এত কঠিন কথা বলে বুকে ছুরি মারতে পারলে? তার চেয়ে সত্যিকার ছুরি মেরে একেবারে শেষ করে দিলে শান্তিতে মরতে পারতাম। মরার সময় ভাবতাম আমার ঝর্ণা আমাকে তিলে তিলে যন্ত্রণা না দিয়ে মেরে মুহূর্তের মধ্যে ….। ঝর্ণা তাকে কথাটা শেষ করতে দিল না। সাইফুলের মুখে হাত চাপা দিয়ে ডুকরে কেদে উঠে বলল, প্লীজ, চুপ কর। ওয়াদা করছি, আমি আর ওরকম কথা বলব না। ঝর্ণা ভুলে গেল, বিয়ের আগে এরকম আলিঙ্গনবদ্ধ হওয়া ইসলামে হারাম। সেও তাকে দু’হাতে জড়িয়ে ধরে সাইফুলের বুকে মাথা রেখে আবার বলল, ঐ কথা বলা আমার অন্যায় হয়েছে। মাফ করে দাও বলে ফুলে ফুলে কঁদতে লাগল।

নাজনীন এতক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তাদের কথা শুনছিল, আম্মাকে মামার জন্যে একগ্লাস দুধ নিয়ে আসতে দেখে মামা বলে ডেকে উঠল । নাজনীনের গলা পেয়ে ঝর্ণা আলিঙ্গনমুক্ত হয়ে আঁচল দিয়ে প্রথমে সাইফুলের ও পরে নিজের চোখ-মুখ মুছে ফেলল। | মনিরা দরজার কাছে এলে নাজনীন ফিস ফিস করে বলল, একটু দাঁড়াও। আন্টি মামার সঙ্গে কথা বলছে। তারপর আম্মার হাত থেকে দুধের গ্লাসটা নিয়ে বলল, তুমি। এখন যাও, পরে আন্টির সঙ্গে কথা বলাে। আমি এটা নিয়ে যাচ্ছি।

মনিরা ব্যাপারটা বুঝতে পেরে কিছু না বলে চলে গেল। নাজনীন আরাে একটু অপেক্ষা করে বলল, মামা তােমার দুধ নিয়ে এসেছি।। সাইফুল বলল, আয়, নিয়ে আয়। নাজনীন ভিতরে এলে ঝর্ণা এগিয়ে এসে তার হাত থেকে দুধের গ্লাসটা নিয়ে। বলল, তুমি এখন যাও। নাজনীন তাদের দিকে একবার তাকিয়ে বেরিয়ে গেল। ঝর্ণা দুধের গ্লাস সাইফুলের মুখের কাছে ধরে বলল, খেয়ে ফেল।

দুধ খেয়ে সাইল বলল, এখনও কিন্তু সমস্ত ব্যাপারটা স্বপ্ন মনে হচ্ছে। কবে। আমিনের সঙ্গে তােমার ছাড়াছাড়ি হল? সব বলব, এখন একটু বিশ্রাম নাও। অনেক কথা বলেছ।। এতদিন কোথায় আছ? এক বান্ধবীর বাসায়। নাজনীনকে কত দিন পড়াচ্ছ?

এবারে যতদিন তুমি বিলেতে ছিলে। তা কি করে হয়? আমি তাে যাওয়ার আগের দিন আমার বন্ধু জায়েদের অনুরােধে তার স্ত্রীর এক বান্ধবীকে নাজনীনকে পড়াবার ব্যবস্থা করে যাই। আমিই তােমার বন্ধুর স্ত্রীর সেই বান্ধবী। আমিনের অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে যেদিন তাদের বাসা থেকে চলে আসি, সেদিন থেকে ওদের বাসায় আছি। আমিন তা হলে তােমার ওপর খুব অত্যাচার করত?

ঝর্ণা ঝলছল নয়নে বলল, সে সব কথা আমাকে জিজ্ঞেস করাে না। আমি বলতে পারব। না। শুদু এতটুকু জেনে রাখ, সে পশুর চেয়ে অধম, নরকের কটী । তারপর চোখ মুছে বলল, আর কোনাে কথা নয়, চুপ করে বিশ্রাম নাও। আমি তােমার বন্ধুর বাসায় ফোন করে দিই। নচেৎ শিরীন দেরি দেখে চিন্তা করবে। তারপর ফোন করে শিরীনকে বলল, নাজনীনের মামা আজ এসেছে। আমি তার কাছে আছি। না ফিরলে চিন্তা করিস না।

তাের ডাক্তার ভাই জিজ্ঞেস করলে কি বলব? যা সত্য তাই বলবি।। তােদের মধ্যে সমঝতা হয়ে গেছে তা হলে? আল্লাহপাকের রহমতে ও তােদর দোয়ার বরকতে হয়েছে। শিরীন আলহামদুল্লাহ বলে বলল, এবার ছাড়ি তা হলে? ঝর্ণা হা ছাড় বলে লাইন কেটে দিল।। সাইফুল জিজ্ঞেস করল, শিরীন কে? তােমার বন্ধুর স্ত্রী আর আমার বান্ধবী। এবার চুপ করে শুয়ে থাক তাে বলে ঝর্ণা তাকে শুইয়ে দিয়ে মাথার কাছে বসে তার চুলে হাত বুলােতে লাগল। আসরের আযান। শুনে বলল, আমি বুবুর রুমে গিয়ে নামায পড়ে আসি। তুমি কি নামায পড়বে?

মদ ধরার পর থেকে নামায ছেড়ে দিয়েছি।।

ঝর্ণা তার মুখের দিকে তাকিয়ে চিন্তা করল, আমার জন্যই আল্লাহর হুকুম অমান্য করে চলেছে। তার চোখে পানি এসে গেল। ভিজে গলায় বলল, আমি নামায পড়ে আসি তা হলে? এস। ঝর্ণা নামায পড়ে এসে সাইফুলের মাথার কাছে বসল। তােমার কথা শুনতে খুব ইচ্ছে করছে।

ঝর্ণা ছলছল নয়নে বলল, এত ব্যস্ত হচ্ছ কেন? কত দূর থেকে এসেছ, তােমার। বিশ্রাম দরকার। মনের বিশ্রাম না হলে, দেহের বিশ্রাম হবে কি করে? তােমার সব কিছু জানার জন্যে মনে অশান্তির ঝড় বইছে। তুমি বল, আমার কোনাে অসুবিধে হবে না। | সেই নরপিশাচের কথা জিজ্ঞেস করতে একটু আগে নিষেধ করলাম। তবু যখন সেই সব কথা শােনার জন্য তুমি অশান্তি ভােগ করছ তখন বলছি শােন, তারপর ঝর্ণা। চোখের পানি ফেলতে ফেলতে সব কথা বলে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদতে লাগল।

Leave a Comment