প্রেম কাহিনী – স্কুল জীবনের প্রেমের গল্প পর্ব 22 |

  প্রেম কাহিনী

Raj { Part 22}


কষ্ট হচ্ছে। ওষুধ খাওয়ার ফলে যন্ত্রণাও আস্তে আস্তে কমে আসছে।
বলল, আল্লাহ নিশ্চয় তােমার দোয়ার বরকতে আমাকে ভালাে করে দেবেন। অত অস্থির হয়ে পড়ছ। কেন? তুমিই তাে বলেছ কুরআনপাকে আছে আল্লাহ সবুরকারীদের সঙ্গে থাকেন।

ঝর্ণা স্বামীকে স্বাভাবিক ভাবে কথা বলতে শুনে বুঝতে পারল, তার যন্ত্রণা কমেছে। আলিঙ্গনমুক্ত হয়ে উঠে বসে স্বামীর চোখ-মুখ মুছিয়ে দিয়ে নিজের চোখ মুছতে মুছতে বলল, তুমি আমার সমস্ত অপরাধ মাফ করে পায়ে ঠাই দিয়ে আমাকে ধন্য করেছ। কিন্তু আমি যে তার প্রতিদানে কিছুই দিতে পারছি না। আমার প্রাণ উৎসর্গ করে যদি তােমাকে আরােগ্য করতে পারতাম, তা হলে আমার জন্ম সার্থক হত।

সাইফুল বলল, ঝর্ণা, এবার তুমি থাম। জীবন উৎসর্গ করার জন্য তােমাকে আমি। বিয়ে করি নি। এত বছর সবুর করে তােমাকে পাওয়ার জন্য আল্লাহর কাছে আকুল প্রার্থনা করেছি। তিনি আমার প্রার্থনা কবুল করে তার এই নাদান বান্দাকে কৃতার্থ। করেছেন। সেই জন্যে চিরকাল তার পবিত্র দরবারে শুকরিয়া আদায় করতে থাকব। তুমি একটু আড়াল হলেই মনে হয়, আমার দেহে প্রাণ নেই। তােমার কিছু হলে আমি হার্টফেল করে মরে যাব।

অনেক অপেক্ষা, অনেক তিতীক্ষার পর আল্লাহ তােমাকে মিলিয়েছেন। তুমি আর ঐসব কথা কোনােদিন মুখে আনবে না।

ঝর্ণা স্বামীর উপর উপুড় হয়ে আবার সারা মুখে চুমাে খেতে খেতে বলল, তুমি চুপ কর। তােমার মনের সব কথা জানি। তারপর তার পাশে বসে আবার বলল, মনে হয়। আল্লাহপাকের রহমতে তােমার যন্ত্রণা একটু কমেছে। এবার ঘুমাবার চেষ্টা কর, আমি তােমার চুলে বিলি কেটে দিই।

সাইফুল তার কোলে মাথা রেখে বলল, আমি ঘুমিয়ে গেলেও আমার কাছে থাকবে বল? থাকব। শুধু নামায পড়ে ভাত খেতে যাব। তুমি নামায পড়েছ?। হা পড়েছি। তুমি নামায পড়ে এখানেই ভাত খাও। সাবুর মাকে ভাত দিয়ে যেতে বল । |

ঠিক আছে, তাই বলছি। তারপর সাইফুলের মাথার নিচে একটা বালিশ দিয়ে। বাথরুম থেকে অযু করে এসে নামায পড়ে খেয়ে উঠে স্বামীর পাশে যখন বসল তখন সাইফুল ঘুমিয়ে পড়েছে। স্বামীর দিকে তাকিয়ে ভাবতে লাগল, গরিব বলে যে সাইফুলকে স্কুল লাইফ থেকে ঘৃণা করে এসেছি, সেই সময় প্রেমের চিঠি দিয়েছিল বলে। যাকে হেডস্যারের হাতে মার খাইয়ে দেশ ছাড়া করেছি, ইউনিভার্সিটিতে আলাপ করতে এলে কয়েকবার যাকে অপমান করেছি, যাকে অপমান করার জন্যে তার সামনে। আমিনের সঙ্গে মাখামাখি করেছি এবং শেষে তাকে জব্দ করার জন্য আমিনকে বিয়েও। করেছি, কিন্তু তবু সে আমার পিছু ছাড়ে নি।

বিয়ের পর একদিন আমিনের অনুপস্থিতিতে তার বাসায় গিয়ে আমাকে বলেছিল, ঝর্ণা, তুমি আমাকে অপমান ও জব্দ করার জন্যে যত রকমের চেষ্টা কর না কেন, তুমি আজীবন আমার বুকের মধ্যে আত্মার পাশাপাশি বাস করবে। আত্মা ছাড়া যেমন মানুষ বাঁচে না, তেমনি তােমাকে অথবা তােমার স্মৃতি না হলে আমিও বাঁচব না। আমি আমৃত্যু তােমার জন্য অপেক্ষা করব।' তখন সাইফুলের কথা শুনে তার মনে হয়েছিল, ছেলেটার মাথা খারাপ হয়ে গেছে। আর।

আজ সেই ঘৃণিত ও অবহেলিত সাইফুল যেন তার আত্মা। সাইফুলের কিছু কষ্ট হলে মনে হয় তারই বেশি কষ্ট হচ্ছে। এই সব ভাবতে ভাবতে ঝর্ণার চোখ দিয়ে পানি। পড়তে লাগল। আসরের নামাযের আযান শুনে স্বামীকে জাগিয়ে দ’জনে নামায় পড়ল।

প্রতিদিন বিকেলে সাইফুলের ড্রাইভার গাড়ি নিয়ে পল্টনের বাসায় গিয়ে মনিরা ও নাজনীনকে এই বাসায় নিয়ে আসে। আবার রাত্রে খাওয়া-দাওয়ার পর তাদেরকে সেই বাসায় পৌছে দেয়। এই সময়টা মনিরা ভাইয়ের সেবা যত্ন করে । নাজনীন কিছু সময় মামার কাছে কাটিয়ে মামীর সঙ্গে নানা রকম গল্প করে কাটায়। বিয়ের পর থেকে নাজনীন ঝর্ণাকে মামী বলে ডাকে। সাইফুল ও ঝর্না নামায পড়ে বসে কথা বলছিল। এমন সময় মনিরা ও নাজনীন এল।

সালাম বিনিময় করে মনিরা জিজ্ঞেস করল, তােদের দুজনের মুখ এত শুকনাে দেখাচ্ছে কেন? আজ কি যন্ত্রণা বেশি হয়েছে। ঝর্ণা বলল, হ্যা বুবু সকাল থেকে যন্ত্রণা অল্প অল্প হচ্ছিল, দুপুরের পর বেশি হয়। আমি ডাক্তার এনেছিলাম। উনি বিদেশ যাওয়ার ব্যাপারে একটু তাড়াতাড়ি ব্যবস্থা। করতে বলে গেলেন। তা কতদূর কি করেছ? | পি. জি. র ডাক্তাররা ব্যবস্থা করেছেন। প্রায় সব ঠিক হয়ে গেছে। ইনশাআল্লাহ। সামনের সপ্তাহে রওয়ানা দেব।

নাজনীন বলল, আমি তােমাদের সঙ্গে যাব। সাইফুল বলল, এখন আর কি করে তা সম্ভব? আগে বললে ব্যবস্থা করা যেত।

সুইজারল্যান্ডে ওরা প্রায় এক বছর হতে চলল এসেছে। সাইফুল এখন সম্পূর্ণ সস্থ। হাসপাতালে সাইফুল পাচ মাস ছিল। সাইফুলের যখন অপারেশন হয় তার এক। সপ্তাহ আগে থেকে ঝর্ণা তার মানত করা রােযা রাখতে এবং নফল নামায পড়তে আরম্ভ করে। আবার অপারেশন যাতে সাকসেসফুল হয়, সে জন্যও ঐ সবের মানত করে। সাইফল হাসপাতালে থাকার সময় সে সব মানত পূরণ করেছে। সাইফুল প্রথমে। অপারেশন করাতে রাজি হয় নি। ঝর্ণা তাকে অনেক বুঝিয়ে রাজি করিয়েছে। সাইফল। রাজি হওয়ার আগে তাকে বলেছে, কেন অপারেশন করতে চাচ্ছি না জান? যদি। এ্যাকসিডেন্টলি আমি মরে যাই, তা হলে তােমার যে কষ্ট হবে, তা কি তমি সহ্য করতে পারবে? আমার আশা আল্লাহ পূরণ করেছেন। এখন তার ইচ্ছায় যদি কিছু হয়, তা হলে আমার এখন আর কোনাে খেদ নেই। শুধু তােমার কথা ভেবে রাজি হচ্ছি না। |

ঝর্ণা চোখের পানি ফেলতে ফেলতে বলেছে, আল্লাহ না করুন, যদি তােমার কিছু। হয়ে যায়, তা হলে নির্ঘাৎ আমিও দম ফেটে মারা যাব । এবার আমি কেন করাতে চাচ্ছি।

শােন, প্রতিদিন তুমি যে কষ্ট ভােগ করছ, তােমার হায়াৎ যতদিন থাকবে ততদিন সেই কষ্ট ভােগ করতে হবে। আল্লাহ হায়াৎ-মউতের মালিক। তিনি যতদিন তােমার হায়াৎ রেখেছেন, ততদিন অপারেশন করালেও বাচবে আর না করালেও বাচবে। আল্লার উপর বিশ্বাস হারাচ্ছ কেন? জান না বুঝি, পাঁচটা জিনিস আল্লাহপাকের হাতে। সেগুলােতে মানুষের কোনাে এখতিয়ার নেই। সেগুলাে হল-হায়াৎ, মউত, রেযেক, ধন-দৌলত ও মান-ইজ্জৎ। যদিও বা আমরা অনক সময় দেখি, মানুষ নিজের চেষ্টায় সভাবে হােক বা অসম্ভবে হােক এগুলাের কোনাে একটায় সফলতা অর্জন করেছে, তা হলে বুঝতে হবে সেটা তার তকৃদিরে ছিল। প্রত্যেক মুসলমানের তকুদিরকে বিশ্বাস করতেই হবে। তুমি জান কি না জানি না, সাতটা জিনিসের উপর পূর্ণ বিশ্বাস না করলে কেউ খাটি মুসলমান হতে পারে না।।

সাইফুল জিজ্ঞেস করল, সেগুলাে কি কি?
ঝর্ণা বলল, (১) আল্লাহ, (২) ফেরেস্তাগণ, (৩) আসমানী গ্রন্থসমূহ, (৪) আল্লাহর। প্রেরিত পুরুষগণ, (৫) কেয়ামত, (৬) তকদির অর্থাৎ আল্লাহপাক ভালােমন্দ নির্ধারনকারী, (৭) মৃত্যুর পর পূর্ণজীবন। কথা শেষ করে সাইফুলকে তার মুখের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকতে দেখে জিজ্ঞেস করল, অমন করে কি দেখছ? সাইফুল বলল, আজকের ঝর্ণাকে কয়েক বছর আগের ঝর্ণার সঙ্গে মিলিয়ে দেখছি। ঝর্ণা ছলছল চোখে বলল, কি দেখলে? সাইফুল বলল, তাদেরকে একই দেখলাম, শুধু আগের ঝর্ণার দ্বীনি এলেম ছিল না।

ঝর্ণা চোখের পানি মুছে বলল, যদি আল্লাহ আমাকে সেই সময় দ্বীনি এলেম দান করতেন, তা হলে দু’জনকে এত কষ্ট ভােগ করতে হত না। তারপর অনেক বুঝিয়ে ও কান্নাকাটি করে তাকে রাজি করিয়ে অপারেশন করিয়েছে। হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর সাইফুলের স্বাস্থ্যের উন্নতির জন্য এবং সেখানকার প্রাকৃতিক দৃশ্য ও জলবায়ু ভালাে লাগায় তারা এতদিন রয়েছে। সাইফুল তার প্রিয়তমা স্ত্রী ঝর্ণাকে নিয়ে পাহাড়ী ঝর্ণা দেখে বেড়াচ্ছে। তাকে সঙ্গে নিয়ে পাহাড়ের কোলে ঝর্ণার ধারে বসে গল্প করে। আল্লাহর অপূর্ব সৃষ্টি মহিমার গুণকীর্তন করে। আর ঝর্ণা তার প্রতি। সাইফুলের প্রেম ও ভালবাসা উপলব্ধি করে নিজেকে স্বামীর মধ্যে বিলীন করে দিয়েছে। মাঝে মাঝে যখন একা থাকে তখন কেঁদে কেঁদে বুক ভাসিয়ে ভেবেছে, আমি হীরের। টুকরাে পায়ে ঠেলে একজন ঘৃণ্য, ইতর ও শয়তানের পিছনে ঘুরেছি।

একদিন কথায় কথায় ঝর্ণা বলল, ভার্সিটিতে পড়ার সময় শুনেছিলাম, তুমি বিখ্যাত কুংফু মাস্টার। সে সব ছেড়ে দিলে কেন? সাইফল বলল, যে কারণে আমি মদ ধরেছিলাম, সেই একই কারণে কুংফু মাস্টারী। ছেড়ে দিয়েছি। এমন সময় হােটেলের পিয়ন একটা চিঠি দিয়ে গেল। সাইফুল চিঠিটা দেখে বুঝতে পারল বুবু দিয়েছে। সে ঝর্ণাকে পড়তে বলল ।

ঝর্ণা জোরে জোরে চিঠিটা পড়ে বলল, বুবু বারবার চিঠি দিচ্ছে ফিরে যাওয়ার। জন্য। অনেক দিন হয়ে গেল, এবার ফেরা দরকার। তা ছাড়া ব্যবসাপত্র কি ভাবে চলছে, সেটাও চিন্তা করা উচিত।
সাইফল তাকে আলিঙ্গনবদ্ধ করে বলল, আমি ক্লাস সিক্স থেকে আল্লার কাছে শুধু তােমাকে চেয়েছি। বাড়ি, গাড়ি, ব্যবসাপত্র কিছুই চাই নি। তােমাকে দেয়ার আগে।

পড়ুন  প্রেম কাহিনী – স্কুল জীবনের প্রেমের গল্প পর্ব 1 | Prem Kahini
Click Here For Next :চলবে

Writer :- Raj

Leave a Comment

Home
Stories
Status
Account
Search