মুখোশ সিজন ২ – রহস্যময় প্রেমের গল্প পর্ব ১১ | মোনা হোসাইন

মুখোশ সিজন ২

Mona Hossain { Part 11 }


রুহি রোজ কে নিয়ে রাজের বাসায় এসে দেখলো,এক বিরাট আয়োজন বাড়িটা খুব সুন্দর করে সাজানো হয়েছে। মনে হচ্ছে বাড়িতে কারোর বিয়ে হচ্ছে।

রুহিঃ ঢং দেখলে বাঁচি না টাকা খরচ করলেই ভাল মানুষ হওয়া যায় মনে করেছে। সাইকো কোথাকার

রুহি রোজ কে নিয়ে গাড়ি থেকে নামতেই সবাই ফুল ছিটাতে শুরু করল রোজের তো এসব খুব ভাল লাগছে কিন্তু রুহির গা জ্বলে যাচ্ছে।

রাজও এখানে আছে।রুহি রাজের কাছে গিয়ে বলল কি হচ্ছে এসব?বন্ধ করুন এগুলো।
রাজ একটানে রোজ কে কোলে নিয়ে বলল সাইডে গিয়ে দাঁড়াও রোজ ঢুকার পর ফুল ছিটানো বন্ধ হয়ে যাবে তুমি না হয় তখন ঢুকো।

রুহি তাছিল্য করে বলল আমি তো ভাবতেই পাচ্ছি না,রাজ চৌধুরীর এতই দুরবস্থা হয়েছে আজকাল কোন মেয়ে তাকে পাত্তা দিচ্ছে না শেষে কিনা বাচ্চা ওয়ালা মেয়ের জন্য পাগল হল..... ছি....ছি...

রাজ একটু হেসে বলল রুহি এখনো এত বোকা আছে আমিও সেটা ভাবতে পারছি না।বাচ্চাদের সামনে কি বলা উচিত আর কি বলা উচিত না সেটাও এখন পর্যন্ত শিখল না।

রুহিঃ সব সময় সব উত্তর তৈরি করাই থাকে তাই না? যতসব।

রাজঃ ভিতরে কি যাবে?বলেই রোজকে নিয়ে রাজ চলে গেল।

রুহিও পিছন পিছন গেল।
রাজঃতোমার রুম এই দিকে তুমি যাও আমি রোজ কে ওর রুমে নিয়ে যাই।

রুহিঃ আপনার কি ওকে বুড়ি মনে হচ্ছে? ও আলাদা রুমে যাবে কেন?

রাজঃকারন আছে তাই যাবে, দিনের বেলা এই রুমে থাকবে রাতের বেলা না।

রুহিঃ রাতের বেলা মানে? আমরা এখানে কতক্ষন থাকব ?
রাজঃ যতক্ষন আমি চাইব।যাও নিজের রুমে যাও।

রুহিঃ না রোজ কে আমি আপনার সাথে কোথাও যেতে দিব না।

রাজঃ অবিশ্বাস করছো আমায়? ঠিক আছে তুমিও চলো।

রোজের রুমে ঢুকে রুহির চোখ ধাঁদিয়ে গেল সারা ঘরে বিভিন্ন খেলনা দিয়ে পরিপুর্ন্য তার মধ্যে রোজের প্রিয় ডলি হাউজ আর টেডিও আছে চারদিক বেলুন দিয়ে সাজানো একপাশে চকলেট বার তাতে হাজার রকম চকলেট সাজানো।
রোজকে রুমে নিয়ে যেতেই রোজ কোল থেকে নেমে সারা রুম জোরে দৌড়াতে শুরু করল।তার খুশি আর দেখে কে।

রুহি রাজের কাছে এসে বলল টাকা খরচ করে বাচ্চাদের খুশি করা যায় কিন্তু মন পাওয়া যায় না বোঝেছেন মিঃ রাজ চৌধুরী?

রাজ হতাশার হাসি দিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেল।
রুহি সারারাত না খেয়ে আছে তার ক্লান্ত লাগছে কিন্তু এই রুমে বসা বা শোয়ার কোন ব্যবস্থা নেই তাই রোজ কে বলল মাম্মাম চলো এখন যাই পড়ে আবার এই ঘরে আসব।
রোজ যেতে রাজি নয়। তাই রুহি ঘরের দরজা লক করে পাশের রুমে গেল।

রুমের দরজা খুলেতেই রুহি চমকে উঠল।
কারন রুমটা একদম সেই ৫ বছর আগের মতই আছে,
,
,
,
,
আসলে কিছুই আগের মত নেই রাজ আগের রুম টার মতই এই বাড়িতেও রুম সাজিয়েছে।

দেয়ালের এক পাশে রুহির সেই ছবি গুলি,চকলেট এর প্যাকেট,ভাংগা চুড়ি,ওড়না সবি আগের মতই আছে।রুহি ছবি গুলির দিকে তাকিয়ে একমুহুর্তের জন্য অতীতে ফিরে গেল
ঘরটা অন্ধকার কোন লাইট নেই।
শুধু কয়েকটা প্রদীপ জ্বালানো আপছা আলোয় মেঝেতে গোলাপের পাপঁড়ি দিয়ে লেখাটা বোঝা যাচ্ছে সেখানে বড় করে লিখা চুড়ির রিনিঝিনি আওয়াজটা আজও মিস করি।
লিখাটা পড়ে রুহি নিজের অজান্তেই কেঁদে ফেলল তার চোখ থেকে পানি ঝরে পড়ল।

রাজ জানালার ফাঁকে রুহির দিকে তাকিয়ে আছে।
এই চোখের জল মিথ্যা বলতে পাড়ে না রুহি তুমি আমায় কতটা ভালবাসো তার প্রমান দিচ্ছে তোমার চোখের জল।কিন্ত আমাদের ভাগ্য এতটাই খারাপ যে ২ জন ২ জনকে এত ভালবেসেও একসাথে থাকতে পাড়ব না।
২ জন এত কাছে থেকেও আজ কত দূরে।
ভাবতে ভাবতে রাজও চোখ ভিজিয়ে ফেলেছে।

রুহি পুরু রুমটা ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগল।তার হোস্টেলে রেখে আসা প্রতিটা জিনিস এই রুমে সযত্নে সাজানো আছে রুমটা দেখতে দেখতে রুহি ভুলেই গেল সে ৫ বছর পড়ে দাঁড়িয়ে আছে। যখন বর্তমানে ফিড়ে আসল রুহির নিশ্বাস ভারি হতে শুরু করল।দম বন্ধ হয়ে আসছে তার।
রুহি এক দৌড়ে বাইরে বেরিয়ে আসল।

সে একবার রোজের রুমের দিকে আবার নিজের রুমের দিকে তাকাচ্ছে।

রুহিঃএকদিকে রোজ একদিকে রাজ কাকে বেচে নিব আমি?২ টা প্রশ্নের মাঝে দাঁড়িয়ে আছি যার কোন উত্তরই আমার জানা নেই।

রাজঃ আমি জানি রুহি কোনো মেয়ের কাছ থেকে তার মাকে কেড়ে নেওয়া যায় না। স্বামির কাছ থেকে স্ত্রীকে ছিনিয়ে নেওয়া যায় না।কিন্তু বেহায়া মন যে মানে না। আমি চলে যাব তোমাদের জীবন থেকে অনেক দূরে চলে যাব আর কখনো ফিড়ব না। যাওয়ার আগে জানিয়ে যেতে চাই আমার ভালবাসা মিথ্যা ছিল না তুমি যেমন আমায় ভালবাসতে আমিও বাসতাম।

তুমি কার সাথে আছো সেটা নিয়ে তোমার স্বামি মাথা ঘামায় না তাই তোমাকে নিয়ে এসেছি না হলে কখনই তোমাকে এখানে আনতাম না।আমি তোমার স্বামির সাথেও কথা বলব আমি তোমার সাথে খারাপ কিছু করি নি তার প্রমান ও দিব। আমি তোমার জীবনে কোন সমস্যার সৃষ্টি করব না রুহি।
জীবনের শেষ একটা দিন আমি তোমার সাথে কাটাতে চাই শুধু এই টুকুই আর কিছু না।

রাজ চোখ মুছে রুহির কাছে আসল।
কি হল ম্যাডাম আর কত না খেয়ে থাকবেন
মেয়েটা তো এবার ক্ষিদের জ্বালায় পাগল হয়ে যাবে।
রুহি নিজের চোখের জল লুকিয়ে বলল হুম চলুন আমি রোজ কে নিয়ে আসছি।

রাজঃ তুমি যাও আমি রোজকে নিয়ে আসছি।

রুহি ঠিক আছে বলে হাঁটতে শুরু করল।তুমি আমায় কতটা ভালবাসো বোঝতে পাড়ছি রাজ কিন্তু আজ আর আমার কিছুই করার নেই নিজের দায়িত্বে বাঁধা পড়ে গেছি।দায়িত্বের শিকল ছিড়ে ফিরে আসার ক্ষমতা আমার আর নেই।

রাজ, রোজ কে নিয়ে নামছে রোজ এর সারামুখে চকলেট লেগে আছে রাজ সেগুলি মুছতে মুছতে আসছে। রুহি এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে রোজ যদি রাজের মেয়ে হত কতই না ভাল হত।কত আদর করে রোজকে।

রুহির ধ্যান ভাংগিয়ে রাজ বলল দেখো তো চকলেট খেয়ে কি অবস্থা করেছে নিজের? একদম মায়ের মত হয়েছে।পরিষ্কার করে দিও তো এমনেতেই মেয়ে আমার মিষ্টি পড়ে আবার পিপঁড়ে ধরবে।

রুহিঃ এই আমি কি এভাবে চকলেট খাই নাকি?

রাজঃ জানো রোজ তোমার মাম্মাম তোমার মতই চকলেট খেত সারা মুখ মাখিয়ে মাখিয়ে,আমি মুছে দিতাম।

রুহি নিজের অজান্তেই বলে উঠল সেদিনের পড়ে আর কখনো খাওয়া হয় নি।

মুহুর্তেই রাজের মুখের হাসিটা বীলিন হয়ে গেল।
রাজ নিজেকে সামলে নিয়ে বলল খাবার দাও ক্ষিদে পেয়েছে।

রুহিও নড়ে চরে ঠিক হয়ে বলল আমি এখানকার কিছুই তো চিনি না তাহলে খাবার কোথা থেকে আনব?

রাজঃরান্না ঘরে সব রাখা আছে শুধু নিয়ে আসলেই হবে রান্নাঘর টা ওই দিকে।

রুহি রান্না ঘরে গিয়ে দেখল ট্রে তে সব সাজানো আছে।
রুহি ট্রে নিতে গিয়ে লক্ষ্য করল ট্রের এক পাশে এক গাছা কাচের চুড়ি রাখা রুহির বোঝতে দেড়ি হল না যে রাজ চায়,সে চুড়ি পড়ুক।
রুহি চুড়ি গুলি পড়ে নিল।

রুহি এসে ২ জনকেই খাবার দিচ্ছে রুহির চুড়ির আওয়াজে রাজ হারিয়ে গেল।

হঠাৎ রোজ বলে উঠল মাম্মাম এগুলো কি।রাজ রোজের কথায় ভাবনার জগত থেকে ফিরে আসল।

রুহিঃ এগুলোকে চুড়ি বলে মান্মাম।

রোজঃ এগুলি কি তোমার?তোমাকে তো আগে কখনো এগুলো পড়তে দেখি নি।

রুহি রাজের দিকে তাকিয়ে বলল আগে পড়লে হাত জ্বালা করত তাই পড়তাম না।তুমি খাও মা। পড়ে কথা বলো।

রাজঃ তারমানে এই ৫ বছর তুমি চুড়ি পড়ো নি রুহি,চকলেট ও খাও নি আমার জন্যে নিজের পছন্দগুলিকে বিসর্জন দিয়েছিলে?

রোজঃ আমি তো একটু আগেই খেয়েছি।মাম্মাম আর খাব না।

রুহিঃ চকলেট খেয়ে পেট ভরে না মা দুধ খাও বা নাস্তা খাও।

রোজঃ আমি তো ঘুম থেকে উঠেই দুধ খেয়েছি

রুহিঃ মানে কি?কে খাওয়ালো?

রাজ বারবার রোজকে বাধা দিতে চাইল কিন্তু রোজ বলেই দিল।

পাপা আমাদের বাসায় খায়িয়েছিল।
রুহি রাজের দিকে তাকাল।
রাজ আমতা আমতা করে বলল না মানে সারারাত খায় নি কিছু তাই একটু গিয়েছিলাম আর কি....

রুহিঃ সাইকোর সাথে কথা বলে লাভ নেই।
বোঝেছি কি করেছিলেন যাইহোক এবার খান।

রাজঃ তুমিও তো খাও নি আমি যদি তোমাকে আর রোজকে খাইয়ে দেই তুমি কি রাগ করবে?

রোজ বলে উঠল আমি পাপার হাতে খাব মাম্মান খাওয়ার সময় বকা দেয়।পাপা দেয় না।

রুহি আর কিছু বলল না।
রাজ, রোজ আর রুহিকে খায়িয়ে দিল।
খেতে খেতে রুহি বলল নীলয় কোথায় রাজ?

রাজঃ চিন্তা করো না ওর কোন ক্ষতি হয় নি কালকেই দেশে আসবে আসবে নীলয়।

রুহিঃ ও.....

সারাদিন তাদের বেশ আনন্দেই কাটল তাদের।
রাতে রুহি রাজের রুমে আড্ডা দিচ্ছিল রোজ ও আছে। তারা স্নেহা মিনি আর ভার্সিটির বিষয়ে আলোচনা করছিল।
রুহি খেয়াল করল রোজের ঘুম পেয়েছে।
রাজ আমি রোজ কে নিয়ে এবার যাই ওর ঘুম পেয়েছে।

রাজঃ আমি বাইরে যাই তুমি আজ এখানেই ওকে ঘুম পাড়িয়ে দাও প্লিজ প্রতিদিন তো তোমার সাথেই ঘুমায় আজ না হয় আমার সাথে ঘুমাক।

রুহি সায় দিয়ে ঠিক আছে বলতেই রাজ বাইরে চলে গেল।

রোজঃ পাপা অনেক ভাল তাই না মাম্মাম? বাবাই এর মত না তাই না?

রুহিঃহুম ভাল কিন্তু বাবাই ও ভাল তুমি ঘুমাও এখন।
রোজ ঘুমিয়ে পড়ল।

রুহি রোজকে ঘুম পাড়িয়ে বাইরে আসল। রাজ বাইরে দাঁড়িয়ে ফোন টিপছিল রুহি এসে বলল ওই রুম ছাড়া অন্য কোন রুম নেই? আমার ওখানে দম বন্ধ হয়ে আসে।

রাজ গেস্ট রুম দেখিয়ে দিয়ে বলল আমার রুমেই থাকতে বলতাম আমি গেস্টরুমে থাকতাম কিন্তু আমি আজ রোজের সাথে ঘুমাব তাই গেস্ট রুমেই থেকে যাও প্লিজ।বলে রাজ ঘরে চলে গেল।
রুহি রুমে এসে ঘুমের দেশে পাড়ি দিল
,
,
,
,
পরদিন সকালে রুহি রাজের চা আর রোজের দুধ নিয়ে রাজের রুমে গেল।
ঘরে ঢুকে সে মুগ্ধ হয়ে গেল রোজ রাজের বুকে ঘুমিয়ে আছে এ যেন এক অপুরুপ দৃশ্য যা প্রতিটা মা দেখতে চায়।
রুহি বেডের পাশে টেবিলে চা রাখতেই চুড়ির শব্দে রাজের ঘুম ভেংগে গেল কিন্তু রোজ তার বুকে ঘুমাচ্ছে তাই রাজ নড়ল না ওভাবেই শুয়ে থাকল।

রুহি আস্তে করে রোজকে পাশে শুয়িয়ে দিয়ে বলল,রোজ সারারাত এভাবে ঘুমিয়েছে কষ্ট হয় নি তোমার?

রাজঃ কষ্ট...??? কত বছর ধরে এমন একটা রাতের জন্য অপেক্ষা করেছি জানো?
রুহি যানো আজ আমি পরিপূর্ণ আমার কোন কিছুর অভাব নেই মেয়ে আছে ভালবাসার মানুষ কাছে আছে বাড়ি ভর্তি সুখ আছে।আমি সার্থক।আর কোন আফসোস নেই সব পেয়ে গেছি।
,
,
,
,
আমি যদি কোন অন্যায় করে থাকি আমাকে ক্ষমা করে দিও রুহি।কালকের দিনটা আমার জীবনের শ্রেষ্ট দিন ছিল।আর আজকে তোমার চুড়ির শব্দে ঘুম ভাংগাটা আমার সকল স্বপ্ন পুরন করে দিয়েছে।
রাজ বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল গাড়ির চাবিটা হাতে নিল।

রুহিঃ কোথায় যাচ্ছ চা টা খাবে না?

রাজঃ না..... খেতে ইচ্ছা করছে না কাজ আছে যেতে হবে।আর হ্যা আজকে নীলয় আসছে কিছুক্ষন পর বাড়ি চলে যেও নিচে পেন্ড্রাইভে সিসি টিভির একটা ফুটেজ আছে নীলয় কে দেখিও,তুমি এখানে যতক্ষন ছিলে তার প্রতিটা সেকেন্ডের ফুটেজ আছে পেনড্রাইভে ও যেন আমাদের নিয়ে খারাপ কিছু না ভাবে আর তোমাকে সন্দেহ না করে বলে রাজ রোজকে চুমু খেল।তারপর হাঁটতে শুরু করল।
রুহিঃ কিন্তু তুমি কোথায় যাচ্ছো?

রাজ পিছন ফিড়ে কিছু না বলে একটু হেসে বাইরে চলে গেল।
ব্যাপারটা রুহির অদ্ভুদ লাগলেও সে ভাবতে পারেনি এমন কিছু হতে চলেছে......!!!

পড়ুন  মুখোশ – রহস্যময়, রোমান্টিক প্রেমের গল্প পর্ব ৯ | মোনা হোসাইন
পরবর্তী পর্বের জন্য ক্লিক করুন :>> চলবে

Writer :- মোনা হোসাইন

Leave a Comment

Home
Stories
Status
Account
Search